June 14, 2026, 10:09 pm
মো: আনোয়ার হোসেনঃ রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র মতিঝিলের টিএন্ডটি কলেজ এখন আর কোনো বিদ্যাপীঠ নয়, বরং অনিয়ম আর দুর্নীতির এক দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. নূর হোসেনের বিরুদ্ধে নিয়োগ জালিয়াতি, সরকারি বিধির তোয়াক্কা না করে চেয়ার দখল এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের জিম্মি করে কোটি টাকা আত্মসাতের পাহাড়সম অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম-নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এক অদৃশ্য শক্তির জোরে তিনি কলেজটিকে নিজের ব্যক্তিগত জমিদারিতে পরিণত করেছেন বলে দাবি স্থানীয়দের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২০২৪ সালের ২২ মার্চ অনুষ্ঠিত অধ্যক্ষ নিয়োগ পরীক্ষায় দুর্নীতির চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করা হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী নিয়োগ বোর্ডে কমপক্ষে ৩ জন বৈধ প্রার্থী থাকা বাধ্যতামূলক হলেও, নূর হোসেনের ক্ষেত্রে সেই নিয়ম মানা হয়নি। ৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩ জনেরই বয়স ছিল ৫৫ বছরের বেশি, যা সরাসরি অবৈধ। এমনকি যারা পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিলেন, ফলাফল শিটে তাদের নম্বর বসিয়ে ভুয়া কোরাম পূর্ণ দেখানো হয়েছে। দুবার অযোগ্য ঘোষিত হওয়া নূর হোসেনকে তৃতীয়বার রহস্যজনক কারণে যোগ্য ঘোষণা করে নিয়োগ দেওয়া হয়।
কলেজ সূত্রে জানা যায়, দুর্নীতির তদন্তের স্বার্থে গত ১৫ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে তৎকালীন গভর্নিং বডির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোঃ ছগীর আহমেদ স্বাক্ষরিত এক পত্রে নূর হোসেনকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়। চিঠিতে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল, তিনি কোনো প্রশাসনিক বা আর্থিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না। কিন্তু তদন্ত চলাকালীনই ড. ছগীর আহমেদ পদত্যাগ করলে, নূর হোসেন বিধি বহির্ভূতভাবে ব্যারিস্টার বেলায়েত হোসেনকে সভাপতির চেয়ারে বসান। এরপর কোনো বৈধ রেজুলেশন ছাড়াই গায়ের জোরে পুনরায় অধ্যক্ষের চেয়ার দখল করেন তিনি, যা আইনের চরম লঙ্ঘন।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়, অধ্যক্ষের অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই জুটছে অপমান ও বহিষ্কারের হুমকি। ইতোমধ্যেই একজন শিক্ষক ও একজন অফিস সহকারীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং একাধিক শিক্ষককে শোকজ দেওয়া হয়েছে। যেখানে সাধারণ শিক্ষকদের ১৩০ মাসের বেতন বকেয়া, সেখানে অধ্যক্ষ নিজে প্রতি মাসে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৪৫ হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া ও ভাতা নিচ্ছেন একাধিক শিটে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষকরা জানান, সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে শিক্ষকদের কল্যাণ তহবিল নিয়ে। গত ২ মার্চ ২০২৫ তারিখে জনতা ব্যাংকের আরামবাগ শাখা থেকে ‘বেতন সমস্যা’র অজুহাতে ৭ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। উপাধ্যক্ষ থেকে শুরু করে প্রভাষক ও কর্মচারীদের নাম ব্যবহার করে এই টাকা তোলা হলেও, সাধারণ শিক্ষকরা এক টাকাও পাননি। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষকদের চাকরিচ্যুতির ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নিয়ে এই বিশাল অংক সরাসরি অধ্যক্ষের পকেটে গেছে। কলেজের ভবন নির্মাণ, বিদ্যুৎ বিল এবং শিক্ষার্থীদের সেশন ফি বাবদ সংগৃহীত টাকা কলেজ ফান্ডে জমা না দিয়ে হাতে তৈরি অবৈধ রসিদের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হচ্ছে। বিটিসিএল-এর পক্ষ থেকে বারবার আপত্তি জানানো সত্ত্বেও নূর হোসেন বিটিসিএল কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে নিজের অনুগত ব্যক্তিদের নিয়ে পকেট কমিটি গঠন করেছেন। এই কমিটির মাধ্যমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও মাউশির কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে তদন্ত ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম ভেঙে একজন ‘সাময়িক অব্যাহতিপ্রাপ্ত’ ব্যক্তি কীভাবে এখনো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে আর্থিক লেনদেন করছেন, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এই দুর্নীতি সিন্ডিকেট ভেঙে নূর হোসেন ও সভাপতিকে অপসারণ করে কলেজের শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হোক।
একজন সাময়িক অব্যাহতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি কীভাবে এখনো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে আর্থিক লেনদেন করছেন, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই ‘দুর্নীতি সিন্ডিকেট’ ভেঙে নূর হোসেনকে দ্রুত অপসারণ করে কলেজের শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।
এ বিষয়ে জানতে অধ্যক্ষ নূর হোসেন এবং সভাপতি ব্যারিস্টার বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো সাড়া দেননি।