November 30, 2025, 3:25 am
রোহিঙ্গাদের পরিচয়: পশ্চিম মিয়ানমারের রাখাইন ষ্টেটের উত্তরাংশ এবং বাংলাদেশের দক্ষিন পূর্ব সীমান্তে বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী বসবাসকারী জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা। রাখাইন রাজ্যের এক তৃতীয়াংশে রোহিঙ্গাদের বসবাস যার অধিকাংশই মুসলিম। মিয়ানমার সরকার ১৩৫ টি জতিগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দিলেও সবচেয়ে পূরাতন জাতিগোষ্ঠী হওয়ার পরও রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি না দেয়ায় নিজভুমে পরদেশী হিসেবে বসবাস করছে। ১৯৮৯ সালে “আরাকান” শব্দটি মুসলিম নাম হওয়ায় পরিবর্তন করে রাখাইন নামকরন করেছে। রাখাইনে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১৫ লক্ষ হলেও বর্তমানে শুধু বাংলাদেশেই রোহিঙ্গা শরনার্থী ৯ লাখ ছাড়িয়েছে। রোহিঙ্গাদের ইতিহাস: অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে চন্দ্র বংশীয় রাজা মহৎ -ইদ্দ চন্দ্রের সময় আরব মুসলিম বনিকগন নৌবিহারে আরাকানে আসলে তাদের বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত আচরন লক্ষ্য করে বসতি স্থাপনের অনুমতি দেয়। দশম ও একাদশ শতাব্দীতে বদরুদ্দীনসহ বহু আওলিয়ায়ে কিরাম ইসলাম প্রচারে আরাকানে এসে বসতি স্থাপন করেন। ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি বানিজ্যে সফলতা লাভ করতে থাকেন। এমনকি সেখানে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। পঞ্চদশ শতাব্দীতে আরাকানের শাসনকর্তা নরমিখলা মুদ্রায় কালেমা ও মুসলিম নাম লিখার নীতি চালু করেন। ১৪৩০-১৭৮৪ খ্রিঃ ৩৫৫ বছর ¤্রাউক-উ রাজাগনের শাসনামল ছিল আরাকানী মুসলমানদের আর্শীবাদ। এসময় মুসলমাদের প্রধানমন্ত্রী, সৈন্য মন্ত্রী, মন্ত্রী, কাজী, উচ্চ ও নি¤œ পদস্থ কর্মচারী নিয়োগ দেন। এজন্য সেখানকার সভ্যতা, সংস্কৃতির সকল স্থানে মুসলিম রীতি পদ্ধতিসহ পর্দা প্রথাও চালু হয়। ১৬৬১ সালে স¤্রাট শাহজাহানের আমলে বাংলার সুবেদার মুহাম্মদ সুজার সুন্দরী কন্যাকে আরাকান রাজা কর্তৃক বিবাহের প্রস্তাব সুজা প্রত্যাখান করলে তখন হতেই শুরু হয় রোহিঙ্গাদের উপর হত্যা, হামলা, অগ্নি সংযোগ, কারাবরনসহ অবর্ননীয় নির্যাতন। ১৭৮৪ সালে বার্মিজরা আরাকান দখল করে হাজার হাজার মুসলিম হত্যাসহ মসজিদ-মন্দির ধ্বংস করেন। তখন ২ লক্ষাধিক আরাকানী চট্টগ্রামে আশ্রয় নেয়। ১৮২৪-২৬ সালে বৃটিশদের সাথে যুদ্ধে বার্মিজরা পরাজিত হলে চুক্তির মাধ্যমে আরাকান বৃটিশ ভারতের অন্তর্ভূক্ত করা হয়। ১৯৩৭ সালে আরাকানের জনগন শ্বায়ত্ব শাসন চাইলে তাদের ইচ্চার বিরুদ্ধেআরাকানকে বার্মার অন্তর্ভূক্ত করা হয়। ১৯৪২ সালে বৌদ্ধ-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় হাজার হাজার মুসলিম রোহিঙ্গাদের হত্যা করা হয়। বৌদ্ধরা মুসলিমদের তিন শতাধিক গ্রাম জ্বালিয়ে দিলে লক্ষাধিক মুসলিম আরাকান ছাড়তে বাধ্য হয়। ১৯৪৮ সালে ব্যর্থ অভুত্থানে পুনরায় নির্যাতনসহ ভুসম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, চলাফেরা, শিক্ষায় চরম বাধা নিষেধ আরোপ হয় রোহিঙ্গাদের। ১৯৬২ সালে সামরিক সরকার অবৈধ অধিবাসী উল্লেখ করে বিতারনের চেষ্টা করে। “ইমাজেন্সী ইমিগ্রেসন” আইন করে রোহিঙ্গা মুসলিমদের জাতীয়তা কেড়ে নেয়। ১৯৮২ সালে “বার্মা সিটিজেনশিপ ল” এর মাধ্যমে বেশকিছু মৌলিক অধিকার ছিনিয়ে নেয়। ১৯৮৯ সালে আরাকান নাম পরিবর্তন করে রাখাইন করা হয়। রোহিঙ্গারা নূন্যতম মানবিক অধিকার হতে বঞ্চিত: রোহিঙ্গারা আইনানুযায়ী কোন সম্পত্তি ও ভুমির মালিক হতে পারে না। সরকারী চাকুরী করতে পারে না। সরকারী চিকিৎসা সেবা পায়না। নিজ পরিচয়ে বিদ্যুৎ, পানি ও জ¦ালানীর আবেদন এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিও হতে পারে না। এজন্য ৮০% রোহিঙ্গারা অশিক্ষিত। বিবাহের জন্য করপ্রদান ও স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া যেমন বিবাহ করতে পারেনা তেমনি দুজনের বেশী সন্তান নেয়া শাস্থিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গন্য। সরকার যেকোনো তাদের বসবাসকৃত ভুমি দখল করতে পারে। বিনা পরিশ্রমে কাজে বাধ্য করা, বৌদ্ধ ধর্ম পালনে বাধ্য করা ও মুসলিম স্থাপনা দখল করে নিচ্ছে সরকারের পৃষ্ঠপোষকরা। শিক্ষা, চিকিৎসায় কোনো পরিচয় পত্র পর্যন্ত দেয়না। দেশের বাইরে এমনকি দেশে ভ্রমনের অনুমতি টুকুও নেই তাদের। এভাবেই তাদের উপর রুটিন মাফিক নির্যাতনে গত চার দশকে একের পর এক নির্যাতনে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে প্রায় ২০ লাখ রোহিঙ্গা। এছাড়াও বর্তমানে সংঘবদ্ধ ধর্ষনকে রোহিঙ্গা বিতারিত করার হাতিয়ার হিসেবে গ্রহন করেছে চরিত্রহীন সেনারা। সন্তান ও ভাইদের পশুর মত বেধে রেখে তাদের সামনেই মা ও বোনকে ধর্ষন যেন বিশ্বের সকল ইতিহাসকে হাড় মানতে শুরু করেছে। হাজার হাজার রোহিঙ্গাদের পশুর মত গলায় রশি বেধে গোয়াল ঘরে বন্ধি করে রেখে সকলের সমানেই কারো হাত, কারো পা কেটে, কাউকে গুলি করে আবার কাউকে জবাই করে হত্যা করা হচ্ছে। বাড়িঘর সব জ্বালিয়ে ও ভেঙ্গে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। এভাবেই বিশ্ব বিবেকের সামনেই ১৩০০ বছরের পরানো জাতি রোহিঙ্গাদের মানবতা আজ পশুত্বের চেয়েও নিচ পর্যায়ে। (অ্যাডভোকেট আব্দুর রহিম মিঠন, জজ কোট, নওগাঁ)