March 3, 2026, 6:13 pm
মিজানুর রহমান, মাগুরা প্রতিনিধি:
মাগুরা জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও মাগুরা -২ আসনের সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামাল সক্রিয় রাজনীতি ও ভবিষ্যতের সব ধরনের নির্বাচন থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন।
২৬ ডিসেম্বর শুক্রবার রাত ১২টার পরে নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক দীর্ঘ আবেগঘন স্ট্যাটাসে তিনি এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
স্ট্যাটাসে কাজী সালিমুল হক কামাল বলেন, দীর্ঘ সাত বছর কারাবাসে তার পরিবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিবারের একান্ত অনুরোধে তিনি আর কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না এবং সক্রিয় রাজনীতি থেকেও চিরতরে সরে দাঁড়াচ্ছেন। জীবনের বাকি সময় পরিবারকে নিয়ে শান্তিতে কাটাতে চান বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মাগুরা-২ আসনের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ২০০৮ সালের পর থেকে রাজনীতি থেকে তিনি অনেকটাই দূরে ছিলেন, তবুও ২০১৭ সালে একটি মিথ্যা মামলায় কারাবরণ করতে হয় তাকে। দীর্ঘ কারাবাস শেষে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর অসুস্থ শরীরে ২২ আগস্ট তিনি কারামুক্ত হন। মুক্তির দিন নেতা-কর্মীদের ভালোবাসা ও আবেগ তাকে বাকরুদ্ধ করে দেয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মুক্তির পর মাগুরায় খুব বেশি না আসতে পারলেও মোহাম্মদপুর, আড়পাড়া, সিংড়া ও শত্রুজিৎপুরে কয়েকটি সংবর্ধনায় অংশ নেন। এসব কর্মসূচিতে নেতা-কর্মীদের চোখে ১৬ বছরের জমে থাকা কষ্ট ও বেদনা দেখেছেন বলে স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন সাবেক এই সংসদ সদস্য।
দলের হাইকমান্ডের উদ্দেশ্যে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে প্রশ্ন তুলে কাজী সালিমুল হক কামাল বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছর মামলা, হামলা, জেল ও নির্যাতন সহ্য করে যারা বিএনপির পতাকা আগলে রেখেছেন, তৃণমূলের সেই নেতা-কর্মীদের আবেগ ও অনুভূতির কোনো মূল্য কি আদৌ আছে? ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের নির্বাচনের জন্য মাগুরা-২ আসনে প্রাথমিক প্রার্থী ঘোষণার পর তৃণমূল পর্যায়ে যে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়েছে, তা হঠাৎ নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বঞ্চনার ফল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্ট্যাটাসে তিনি উল্লেখ করেন, মাগুরা-২ আসনের ৫১৩ জন দায়িত্বশীল নেতার মধ্যে ৫০১ জন, ১৯টি ইউনিয়নের ১৮ জন সাবেক চেয়ারম্যান এবং দুজন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান লিখিতভাবে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। তাদের মতে, ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের অবমূল্যায়ন করে বিতর্কিতদের পুনর্বাসন দলের আদর্শিক ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে। তৃণমূল নেতাদের এই আশঙ্কা ও আপত্তিকে গুরুত্ব না দেওয়ায় নেতা-কর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা সৃষ্টি হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, তৃণমূলই দলের প্রাণ। হাজার হাজার ত্যাগী কর্মীকে উপেক্ষা করে একতরফা সিদ্ধান্ত নিলে দল শক্তিশালী হয় না; বরং ভেতর থেকে ক্ষয়ে যায়। মাঠপর্যায়ের কর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে তার দায়ভার কার? সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
আড়পাড়ার এক প্রতিবাদ সভার প্রসঙ্গ টেনে কাজী সালিমুল হক কামাল বলেন, তিনি কখনও নিজের জন্য মনোনয়ন চাননি। তৃণমূলের পছন্দ অনুযায়ী অন্য কোনো যোগ্য প্রার্থী দিলেও নেতা-কর্মীরা মেনে নিতেন। তবে দলের বর্তমান অনড় অবস্থান দেখে তিনি উপলব্ধি করেছেন, এখানে তৃণমূলের যুক্তি বা আবেগের কোনো মূল্য নেই।
স্ট্যাটাসের শেষাংশে তিনি নেতা-কর্মীদেরকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ক্ষোভ থাকলেও এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যাতে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তরুণদের সামনে রাজনীতিতে এগিয়ে যাওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ইতি টেনে তিনি লেখেন, তারুণ্যের জয় হোক। তবে মনে রাখবেন, কর্মীদের চোখের পানি কখনও দলের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না।
উল্লেখ্য, কাজী সালিমুল হক কামাল ১৯৯৪ সালের বহুল আলোচিত উপ-নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট শফিকুজ্জামান বাচ্চুকে পরাজিত করে নিজের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করেন। ওয়ান-ইলেভেন সময়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় তিনি দশ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে কারাভোগ করেন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২৩ আগস্ট তিনি কারামুক্ত হন।
তার অবসর ঘোষণাকে কেন্দ্র করে মাগুরা-২ আসনের বিএনপির রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।