March 3, 2026, 2:01 pm
বিশেষ প্রতিবেদনঃ নওগাঁ জেলা শহরের বুক চিরে প্রবাহিত ছোট যমুনা নদী রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম। বুধবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক Islam Mohammad Tarequl (https://www.facebook.com/islam.mohammadtarequl) আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর মধ্যে ছোট যমুনা একটি-যা দিনাজপুর, জয়পুরহাট, নওগাঁ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। গবেষকদের মতে নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৬ কিলোমিটার। পোস্টে তিনি উল্লেখ করা হয়, এক সময় যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলেও কালের পরিক্রমায় নদীটি এখন জীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। পানি দূষণ, ময়লা-আবর্জনা ফেলা, পলি জমা ও দখল- বেদখলের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, নদী একটি দেশের রক্তনালীর মতো। আধুনিক প্রযুক্তি ও সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন সত্ত্বেও নদীর গুরুত্ব কমেনি। তাই নওগাঁ জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অংশ ‘ছোট যমুনা’ নদীকে বাঁচাতে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

নওগাঁ তাল বেলাল খ্যাত সাংবাদিক বেলাল পরিবেন রক্ষায় জেলায় অবদ্ন রাখায় কিছুদিন “দখল আর দূষণে হারিয়ে যাচ্ছে নওগাঁর ছোট যমুনা নদী” শিরোনামের নিউজ প্রকাশ হবার পরে বাংলাদেশ পরিবেশ আইন বীদ সমিতি বেলার নির্দেশনায় সরেজমিনে বেলার টিম সহ পরির্দশন করে নদী রক্ষা কমিশনে দখল আর দূষণ বিষয়ে সরেজমিনে তদন্তের দাবি করলে গত ১২ মে ২০২৪ ইং তারিখে ছোট যমুনা নদী পরিদর্শনে আসে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের উপপরিচালক (গবেষণা ও পরিবীক্ষণ) ও সিনিয়র সহকারী সচিব আমিনুর রহমান, সহকারী প্রধান (জিও-টেকনিক্যাল) তৌহিদুল আজম, পানি উন্নয়ন বোর্ড নওগাঁ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী ফইজুর রহমান, পরিবেশ অধিদপ্তর নওগাঁর সহকারী পরিচালক নাজমুল হোসাইন, বদলগাছী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আতিয়া খাতুন এবং বেলা’র নেটওয়ার্ক সদস্য ও নওগাঁ পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মাহমুদুন নবী বেলাল। পরিদর্শনে প্রতিনিধি দলটি নদী রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ জনগণের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এবং পরিশেষে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার ও নদীর দুই পাশে অবৈধ দখল উচ্ছেদে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেন। কিন্তু এখন পযর্ন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি।
১২ মে ২০২৫ তারিখে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিনিধি দল নওগাঁ জেলার সদর ও বদলগাছী উপজেলার ছোট যমুনা ও তুলসীগঙ্গা নদীর বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনে দেখা যায় নদীর অংশবিশেষে অবৈধ দখল ও স্থাপনা, নদীপথে বর্জ্য জমে প্রবাহে বাধা সৃষ্টি, স্বল্প উচ্চতার ব্রিজ পানিপ্রবাহে প্রতিবন্ধক, দীর্ঘদিন নদী খননের অভাব, অপরিকল্পিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, পরিবেশ অধিদপ্তরের সহায়তায় নদীর পানি থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, যাতে দূষণের মাত্রা ও ধরন নির্ণয় করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
এই নদীসমূহ ভূতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ; এদের স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা না করলে কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রস্তাবিত সুপারিশসমূহ: ✔ অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা, ✔ বর্জ্য অপসারণ করা, ✔ নদী খনন করা, ✔ পানি উত্তোলনে নিয়ন্ত্রণ ও ✔ জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা।

নওগাঁ জেলার নদীর সংক্ষিপ্ত তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো।
বাংলাদেশের একটি সমৃদ্ধ এবং জনপদের নাম নওগাঁ। ১১ টি থানা/উপজেলা নিয়ে গঠিত তিনটি প্রধান নদী রয়েছে।
১। নওগাঁ জেলার মানচিত্রে পশ্চিম ভারত সীমান্ত পোরশা উপজেলার নিতপুর সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত “পূর্ণভবা” নদী।
২। নওগাঁ জেলার মধ্য ভাগ দিয়ে ধামুইরহাট, নজিপুর, মহাদেবপুর, মান্দা ও আত্রাই উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত “আত্রাই” নদী। এ জেলার সব চাইতে বৃহৎ নদী এটি। ৩। নওগাঁ জেলার মঠিক পূর্ব ভাগে বদলগাছী উপজেলা ও নওগাঁ সদর উপজেলার মধ্য ভাগ দিয়ে নওগাঁ শহরকে দুই ভাগ করে প্রবাহিত হয়েছে “ছোট যমুনা” নদী। আজকের লেখার মূল বিষয় হচ্ছে ছোট যমুনা নদী। মূলত তিস্তা নদীরই একটি শাখা ছোট যমুনা নদী।
এ নদীর উপর গড়ে উঠেছে নওগাঁ জেলা শহর। ছোট যমুনা নদী বাংলাদেশের উত্তরাংশের দিনাজপুর জেলা, জয়পুরহাট ও নওগাঁ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার একটি নদী। গবেষকরা বলেন নদীটির দৈর্ঘ্য ৫৬ কিলোমিটার।

ইতিহাস থেকে জানা যায় নওগার উপর দিয়ে বয়ে চলা এই ছোট যমুনা নদীটি গ্রীষ্মকালে সরু এবং শুষ্ক হয়ে যায় কিন্তু বর্ষায় ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করত। শহরের আশেপাশে অনেক জেলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত। এই নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে প্রাচীন জনপদ নওগাঁ শহর। নদী ছিল যাতায়াতের এবং পণ্য পরিবহনের প্রধান পথ। কিন্তু কালের পরিক্রমায় ছোট যমুনা নদী এখন অনেকটা বার্ধেককে পৌঁছে গেছে। জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় মোটামুটি টিকে আছে। পানি দূষণ, ময়লা আবর্জনা নদীতে ফেলা নদীতে পলি জমা, দখল বেদখল সহ বিভিন্ন কারণে নদীর জৈব বৈচিত্র্য অনেকটাই কমে গেছে। আমার সরকারি বাসার পাশেই নওগাঁ জেলার এক সময়কার প্রাণ ভোমরা ছোট যমুনা নদী প্রবাহিত। আজকে সকালে বের হওয়া পূর্বে ছোট যমুনার পাশে এই ছবিটি তোলা হয়। নদী হচ্ছে একটা দেশের রক্তনালীর মত। আধুনিক প্রযুক্তি এবং সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন সত্ত্বেও এখনো নদীর গুরুত্ব কোন অংশে বাংলাদেশে কমেনি। চলুন আমরা সবাই মিলে নওগাঁ জেলার নয়নাভিরাম “ছোট যমুনা” নদীকে বাঁচিয়ে রাখি।
নওগাঁ জেলায় আত্রাই, ছোট যমুনা, নাগর, তুলসীগঙ্গা, ইরামতি সহ অসংখ্য নদ-নদী রয়েছে (প্রায় ১৮টির মতো), যার মধ্যে আত্রাই ও ছোট যমুনা প্রধান, কিন্তু দখল ও দূষণের কারণে অনেকগুলোই বর্তমানে মরা খালে পরিণত হয়েছে; নওগাঁ নামের উৎপত্তিই হয়েছে ‘নও (নতুন)’ ও ‘গাঁ (গ্রাম)’ থেকে, যা আত্রাই নদীর তীরে গড়ে ওঠা নতুন গ্রামকে কেন্দ্র করে, যা এই অঞ্চলের নদ-নদীর গুরুত্ব তুলে ধরে।
জেলার নদ-নদীর সংখ্যা ও পরিচয়:
প্রধান নদী: আত্রাই, ছোট যমুনা, নাগর, তুলসীগঙ্গা, ইরামতি, গুরনাই, গোকশী, শিব, ফকিরনী, শিহারা, মহিষবাথান, কুসুম্বা, চিরি, গৌর, পুরাতন আত্রাই ইত্যাদি নদী নওগাঁ জেলায় প্রবাহিত।
নদী শুকিয়ে যাওয়া: দখল ও দূষণের কারণে ছোট যমুনা ও তুলসীগঙ্গার মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোও এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে, যা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ।
নদীর উৎস: আত্রাই নদীর উৎপত্তি হয়েছে দিনাজপুর জেলার ধানপাড়া বিল এলাকা থেকে, যা নওগাঁর মির্জাপুর পর্যন্ত ১১০ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়েছে।
ইতিহাস: ও নামকরণ: ‘নওগাঁ’ শব্দটি ফরাসি শব্দ ‘নও (নতুন)’ এবং দেশীয় ‘গাঁ (গ্রাম)’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘নতুন গ্রাম’। নদী ও শহরের সম্পর্ক: আত্রাই নদীর তীরবর্তী একটি নদী বন্দর এলাকাকে কেন্দ্র করে নতুন গ্রাম গড়ে ওঠে, যা ধীরে ধীরে নওগাঁ শহর এবং পরে জেলায় রূপান্তরিত হয়।
জেলা প্রতিষ্ঠা: নওগাঁ মহকুমা ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ ১১টি উপজেলা নিয়ে জেলা হিসেবে ঘোষিত হয়, যা ছিল মূলত নদী কেন্দ্রিক এই জনপদেরই একটি প্রশাসনিক রূপান্তর।
গুরুত্ব: নদীগুলো শুধু কৃষিকাজ ও যোগাযোগের মাধ্যমই ছিল না, বরং এই অঞ্চলের জীবন ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, যদিও বর্তমানে নদী দূষণ ও ভারতের পানি প্রত্যাহারের কারণে অনেক নদীই তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ হারাচ্ছে।
১। আত্রাই নদীর ইতিহাসঃ ভারতের হিমালয় অঞ্চলে উৎপত্তি হয়ে করতোয়া নদী নাম ধারন করে প্রথমে বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার বুড়িবর্ত এলাকা দিয়ে প্রবেশ করে পুনরায় দিনাজপুর জেলা সদর উপজেলার শংকরপুর ইউনিয়নে এসে আত্রাই নাম ধারণ করে ভারতে প্রবেশ করে, পরবর্তীতে ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পুনরায় নওগাঁ জেলার ধামুরহাট উপজেলার আলমপুর ইউনিয়ন দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। নওগাঁ জেলার ধামুরহাট, পত্নীতলা, মহাদেবপুর, মান্দা, আত্রাই উপজেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়। সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার পোটাজিয়া ইউনিয়নে এসে হুড়াসাগর নদীতে পতিত হয়েছে।
২। ছো্ট যমুনা নদীর ইতিহাসঃ দিনাজপুর জেলার ইছামতি নদী পার্বতীপুর উপজেলার মোমিনপুর ইউনিয়নে ছোট যমুনা নাম ধারণ করে। নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নে আত্রাই নদীতে পতিত হয়েছে।
৩। তুলশী গঙ্গা নদীর ইতিহাসঃ দিনাজপুর জেলার নওয়াবগঞ্জ উপজেলার শালখুড়িয়া ইউনিয়নের নিমণভূমি থেকে উৎপত্তি। নওগাঁ জেলার সদর উপজেলার তিলকপুর ইউনিয়নে ছোট যমুনা নদীতে পতিত হয়েছে।
৪। শীব নদীর ইতিহাসঃ নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার ভলাইন ইউনিয়নে আত্রাই নদী থেকে উৎপত্তি। রাজশাহী জেলার পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভায় বার্নাই নদীতে পতিত হয়েছে।
৫। ফকিরণী নদীর ইতিহাসঃ নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার প্রসাদপুর ইউনিয়নে আত্রাই নদী থেকে উৎপত্তি। রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার গনিপুর ইউনিয়নে বার্নাই নদীতে পতিত হয়েছে।
৬। পুনর্ভবা নদীর ইতিহাসঃ এটি একটি সীমামত্ম নদী। দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ উপজেলার শীবরামপুর ইউনিয়নের নিমণাঞ্চল থেকে উৎপন্ন হয়ে বিরল উপজেলা দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে পুনরায় নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। নবাবগঞ্জ জেলার গোমসত্মাপুর উপজেলার রহনপুর পৌরসভার নিকট মহানন্দা লোয়ার (নবাবগঞ্জ) নদীতে পতিত হয়েছে।