March 3, 2026, 11:41 am
সাজ্জাদ মাহমুদ সুইট, রাজশাহীঃ
সময় বদলেছে, বদলেছে চিকিৎসার ধরণ। পাল্টে গেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। কিন্তু শত বছরের দীর্ঘ পরিক্রমায় একটি জিনিস আজও অপরিবর্তিত—তা হলো রোগীদের নিখাদ বিশ্বাস। বলছি ডাঃ তুষার, তাঁর বাবা এবং দাদার কথা। গত একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই চিকিৎসক পরিবারটি তাঁদের সেবার মাধ্যমে হয়ে উঠেছেন এলাকার লক্ষ মানুষের পরম নির্ভরতার প্রতীক।
দাদার সেই আদি শুরু আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে, যখন যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল দুর্গম আর আধুনিক চিকিৎসার আলো পৌঁছায়নি সাধারণের দোরগোড়ায়, তখন এই চিকিৎসা যাত্রার সূচনা করেন ডাঃ তুষারের দাদা ডাক্তার মতি মিয়া । সেই সময় কেবল ঔষধ নয়, বরং পরম মমতা দিয়ে রোগীদের সুস্থ করে তোলাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য নয়, বরং আর্তমানবতার সেবাই ছিল তাঁর ব্রত। সেই আদি সময় থেকে আজ অবধি তাঁদের চেম্বারটি হয়ে আছে অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল।
উত্তরাধিকারের যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে সেই স্বর্ণযুগ দাদার দেখানো পথেই হেঁটেছেন ডাঃ তুষারের বাবা ডাক্তার মোস্তফা কামাল । তিনি এই পারিবারিক চিকিৎসাকে আরও সুসংগঠিত এবং জনপ্রিয় করে তোলেন। এলাকার মানুষের কাছে তিনি কেবল একজন ডাক্তার ছিলেন না, ছিলেন বিপদের বন্ধু। গভীর রাতেও যখন কেউ দরজায় কড়া নাড়ত, তিনি ক্লান্তিহীন হাসিমুখে সেবা দিয়ে যেতেন। তাঁর সময়েই মূলত এই পরিবারের ওপর মানুষের আস্থা ‘পাথরে খোদাই করা’ বিশ্বাসের মতো মজবুত হয়ে ওঠে।
আধুনিকতার সাথে ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে ডাঃ তুষারের যুগের বর্তমানে এই গুরুদায়িত্ব পালন করছেন ডাঃ তুষার। তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের সেই প্রাচীন অভিজ্ঞতাকে বিসর্জন না দিয়ে বরং তার সাথে যুক্ত করেছেন আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ধ্যান-ধারণা।
ডাঃ তুষার দাদার ডায়েরি এবং বাবার হাতে লেখা চিকিৎসার নথিপত্র থেকে যেমন বিরল জ্ঞান সংগ্রহ করেছেন, তেমনি সমসাময়িক হোমিওপ্যাথি আপডেট নিয়েও কাজ করছেন। চর্মরোগ, দীর্ঘস্থায়ী পেটের সমস্যা কিংবা জটিল সব ক্রনিক ডিজিজ—যেখানে আধুনিক চিকিৎসা অনেক সময় ব্যয়বহুল বা দীর্ঘমেয়াদী হয়, সেখানে ডাঃ তুষারের চিকিৎসায় মিলছে অভাবনীয় সাফল্য। অনেক পরিবার এমন আছে যাদের চার প্রজন্মই এই পরিবারের কাছে চিকিৎসা নিয়েছে। এটিই ডাঃ তুষারের সবচেয়ে বড় অর্জন।
স্থানীয় একজন বৃদ্ধ রোগী (৮০) আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “আমি যখন ছোট ছিলাম, আমার বাবা আমাকে ডাঃ তুষারের দাদার কাছে নিয়ে যেতেন। আমার ছেলেকে নিয়ে এসেছি ওনার বাবার কাছে, আর এখন নাতিকে নিয়ে আসি ডাঃ তুষারের কাছে। এই পরিবারট আমাদের কাছে একটা আশীর্বাদ।”
ব্যবসায়িক যুগে যেখানে চিকিৎসা আজ পণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে ডাঃ তুষার এবং তাঁর পূর্বপুরুষদের এই নিভৃত সাধনা এক অনন্য দৃষ্টান্ত। শত বছরের এই গৌরবময় যাত্রা কেবল একটি পেশার ইতিহাস নয়, বরং এটি মানবতা ও মমতার এক জীবন্ত দলিল।
ডাঃ তুষার মনে করেন, এই সেবা কেবল তাঁর দায়িত্ব নয়, এটি তাঁর পূর্বপুরুষদের দেওয়া এক পবিত্র আমানত। আর সেই আমানত রক্ষার নেশাতেই তিনি প্রতিদিন গড়ে তুলছেন এক সুস্থ ও হাসিখুশি সমাজ।