March 3, 2026, 2:28 pm

শিরোনাম :
বিটিসিএলে কর্মকর্তা কর্মচারীদের অফিস ছাড়তে লাগবে ঊর্ধ্বতনদের বিশেষ অনুমতি পুঠিয়ায় ৩ সার ব্যবসায়ীকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা ধামইরহাটে ব্র্যাকের সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচির অবহিতকরণ সভা অনুষ্ঠিত নন্দীগ্রামে আকবর এগ্রো অটো রাইস মিল ও বীজ হিমাগারে আলু সংগ্রহের উদ্বোধন অনুমোদনহীন ঈদ মেলার আয়োজন বন্ধ করল প্রশাসন মার্কেট দখল ও অপরাধের অভিযোগ ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’-সংবাদ সম্মেলনে ইব্রাহিম চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ৫৩ বিজিবির পৃথক পৃথক অভিযানে ভারতীয় ১০ গরু জব্দ পোরশায় নিতপুর ইউনিয়ন জামায়াতের ইফতার অনুষ্ঠিত নন্দীগ্রামে লাচ্ছা-সেমাই কারখানায় মোবাইল কোর্টে’র অভিযান, ২০হাজার টাকা জরিমানা রাজপথের লড়াকু সৈনিক নুরুজ্জামান খান মানিক: তৃণমূলের আস্থার বাতিঘর!

গ্রামীণ ঐতিহ্য ‘খেজুরের রস’ আজ বিলুপ্তির পথে, হতাশ গাছিরা

ওবায়দুর রহমান,  দুমকি(পটুয়াখালী) প্রতিনিধিঃ একসময় শীতের শুরুতেই গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের ধুম পড়ে যেতো। খেজুর রস ছোট বড় সকলের কাছেই ছিল একটি রুচিকর সুস্বাদু খাবার। সারা  শীত জুড়ে খেজুরের গুড়, পিঠা,পুলি, পায়েস উৎসব চলতো ঘরে ঘরে। কালের বিবর্তনে আধুনিকতার ছোঁয়ায়, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচর্যা, নতুন করে রোপন আর দক্ষ গাছিয়াদের অভাবে ক্রমশই হারিয়ে যাচ্ছে এক সময়ের জনপ্রিয় খেজুর গাছ ও সুস্বাদু রস। শীতের আগমনে গ্রামীণ সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয় খেজুর গাছের রস সংগ্রহ। এসময় গাছিদের কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি পায়। আগেকার দিনে শীতের শুরুতে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করতে ধুম পড়ে যেতো গ্রামীণ জনপদের ঘরে ঘরে। শহরায়নের আগ্রাসনে প্রকৃতির ঐতিহ্য খেজুর গাছ হারিয়ে যাচ্ছে। দিন যত যাচ্ছে খেজুর গাছও ততো কমছে। সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, দুমকি উপজেলার পাঙ্গাশিয়া, লেবুখালী , আঙ্গারিয়া, মুরাদিয়া ও শ্রীরামপুর পাঁচ ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকায় কিছু কিছু খেজুর গাছ দেখা যায়। যেসব স্থানে এক সময় রাস্তার দুই পাশে সারি সারি অসংখ্য খেজুর গাছ ছিল। সেসব স্থানে এখন খেজুর আর গাছ নেই। গ্রামের রাস্তার পাশে কিছু গাছ থাকলেও তাতে তেমন রস হয় না বলে স্থানীয়রা জানান।
জানা গেছে শীতের শুরুতেই রস সংগ্রহের জন্য  খেজুর গাছ কাটা হয়। গাছের অগ্রভাগের একপাশে বেশ খানিকটা কেটে পরিষ্কার করা হয়। পরে বাঁশের কঞ্চি কেটে খিল  চুঙ্গি তৈরি করে গেঁথে দেওয়া হয়। তার ঠিক নিচেই ঝুলানো হয় মাটির হাঁড়ি অথবা প্লাস্টিকের বোতল। গাছের কাঁটা অংশ বেয়ে রস চুঙ্গির মাধ্যমে ফোঁটায় ফোঁটায় হাঁড়ি বা বোতলে  জমা হয়। প্রত্যুষে গাছিরা কলস নিয়ে প্রতিটি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে বড় টিনের কোসায় অথবা বড় বড় পাতিলে জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করা হতো। আবার কিছু কিছু গাছিয়ারা বাজারেও বিক্রি করত।
ঠান্ডা আবহাওয়া, মেঘলা আকাশ আর কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে পর্যাপ্ত রসের জন্য উপযোগী। এ সময়ে প্রাপ্ত রসের সাধ ও ঘ্রাণ ভালো থাকে।
কাক ডাকা ভোরে খেজুর রসের মন মাতানো ঘ্রাণ গ্রামীন জনপদে মুখরিত করে তুলতে।শীতের সকালে খেজুরের রসে মিষ্টি রোদ, কৃষান কৃষাণীর হাসি দারুন প্রাণশক্তি। বিলুপ্তির পথে গ্রামীন এই ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ । তার সাথে দেখা দিয়েছে অত্যন্ত লোভনীয় খেজুর রসের সংকট।
এক সময় গ্রামীণ জনপদে খেজুর রস নিয়ে  পিঠা, পায়েস  উৎসব, গভীর রাতে হাড়ি থেকে  রস চুরি করে খাওয়া অনেকের শৈশবের স্মৃতি আজও অম্লান  হয়ে আছে। গ্রামীন মেঠো পথ, খেজুর গাছের সারি, গাছে রসের হাড়ি আর এখনকার দিনে তেমন একটা চোখে পড়ে না। দেখা মিলে না পাখি আর কীটপতঙ্গের গাছে গাছে রস খাওয়ার দৃশ্য।
খেজুর গাছ বিলুপ্তির কারণ হিসেবে জানা গেছে বিভিন্ন কারণে খেজুর গাছ কর্তন, মরে যাওয়া, তদারকির অভাব এবং নতুন চারা রোপন না করা।
গাছ কমলেও কমেনি খেজুর রসের চাহিদা ও কদর। ঐতিহ্যবাহী কিছু গাছের মধ্যে খেজুর গাছ ছিল অন্যতম। খেজুরের রস ও খেজুরের গুড়ের গন্ধে গ্রামীণ জনপদ মৌ মৌ করত। শীত আসলেই গাছিরা এই সময় অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হতেন। বিভিন্ন পিঠা পুলি ও পায়েস সহ নানা প্রকার খাবার তৈরির জন্য খেজুরের রস ছিল অন্যতম সেরা উপাদান। এজন্য গাছিদের চাহিদার কথা বলে রাখতে হতো। ফলে যাদের খেজুর গাছ ছিল না তারাও রস খাওয়া থেকে বঞ্চিত হতেন না। তখন শীতে আনন্দময় পরিবেশ বিরাজ করতো। বিশেষ করে শীতের মৌসুম এলে গাছিদের আনন্দের সীমা থাকত না। খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য মহাব্যস্ত হয়ে পড়তেন তারা। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য এই খেজুর গাছ আজ অস্তিত্ব সংকটে। যে হারে খেজুর গাছ নিধন হচ্ছে সে তুলনায় রোপন করা হয় না। শীতের মৌসুমে সকালে খেজুরের তাজা রস যে কতটা তৃপ্তিকর তা বলে শেষ করা যাবে না। কৃষি বিভাগ ও কখনো খেজুরের গাছ আবাদ নিয়ে কথা বলতে বা কৃষি মেলায় খেজুরের গাছ রোপনের উদ্বুদ্ধ করার পরামর্শ দিতে দেখা যায় না।
চলতি মৌসুমে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, মাঝে মধ্যে কিছু কিছু গাছিরা খেজুর রস সংগ্রহের লক্ষ্যে গাছ পরিস্কার ও ছেলার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তবে তারা জানান, দক্ষ গাছিদের অভাব, অভিজ্ঞ কিছু লোক মৃত্যবরন করেছেন, কারো বয়সের ভারে এখন আর গাছে ওঠা নামা করতে পারে না। আবার কেউ কেউ জীবিকার তাগিদে অন্য পেশায় নিয়োজিত রয়েছে।
মুরাদিয়া ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের ফোরকান মাঝি জানান, বরাবরের মতো এবছরও ১৮/২০ গাছ রস সংগ্রহের লক্ষ্যে কাজ করছি। আশাকরি ১০/১২দিনের মধ্যে রস সংগ্রহ শুরু করতে পারবো। শ্রীরামপুর ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের  দেলোয়ার মৃধা জানান, ১২ টি গাছ পরিস্কার করেছি আগামী সপ্তাহে রস বের করতে পারব বলে আশা করি। খেজুর রসের আকাশচুম্বী চাহিদা থাকা সত্ত্বেও দিন দিন গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। অপরদিকে পরিশ্রমের কাজ হ‌ওয়ায় বর্তমান প্রজন্ম  নিরুৎসাহিত হচ্ছে। ফলে দিন দিন খেজুর রসের চাহিদা বেড়েই চলছে। অপর এক গাছিয়া সুমন খান বলেন, বরাবরের ন্যায় এবারও খেজুর রস সংগ্রহের জন্য গাছ প্রস্তুতের কাজ করছি। নিজের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বিক্রি করে বেশ লাভবান হবো বলে আশা করি।
পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের জসিম উদ্দিন বলেন, বাজার থেকে খেজুর রস কিনে প্রতিবছর পরিবারের সবাইকে নিয়ে সুস্বাদু ঠিঠা, পায়েস তৈরি করে খাই। সব বয়সের মানুষের জন্য এটি একটি লোভনীয় খাবার।
এ বিষয়ে উপজেলা দুমকি কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ ইমরান হোসেন বলেন, খেজুর রস একটি মুখরোচক খাবার। কিন্তু নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ও অপরিকল্পিত ভাবে যে হারে খেজুর গাছ ধ্বংস করা হচ্ছে সে তুলনায় রোপন করা হয় না। আমাদের বিভাগের পক্ষ থেকে খেজুর গাছ রোপনের জন্য জনসাধারণকে  উদ্বুদ্ধ করি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *