বিশেষ প্রতিনিধিঃ আধুনিক নওগাঁ শহরে আজ বহু সুরম্য অট্টালিকা গড়ে উঠেছে। তবে শত বছরের প্রাচীন এই শহরের বুকে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ‘বলিহার হাউস’ তার নান্দনিক নির্মাণশৈলী দিয়ে আজও পথচারীদের দৃষ্টি কাড়ে। ভবনটির সুউচ্চ গোল ঘর এবং চিলেকোঠার বৃত্তাকার গম্বুজ দূর থেকেও ঐতিহ্যের জানান দেয়। নওগাঁ শহরের বুক চিরে বয়ে চলা ছোট যমুনা নদীর পশ্চিম তীর ঘেঁষে, বর্তমান উকিল পাড়ায় অবস্থিত এই রাজকীয় প্রাসাদের পেছনে রয়েছে এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
পটভূমি ও জমির মালিকানা:
খতিয়ান অনুযায়ী, পরপর তিন দাগের প্রায় তিন বিঘা জমির ওপর এই ভবনটি নির্মিত। বলিহারের রাজা শরদিন্দু রায় দুবলহাটির রাজা কৃংকড়িনাথ রায়ের কাছ থেকে দলিল মূলে এই জমির মালিকানা লাভ করেন। রাজা শরদিন্দু রায় প্রায়শই অসুস্থ থাকতেন। চিকিৎসকদের পরামর্শে হাওয়া বদলের উদ্দেশ্যে তাঁকে নিয়মিত রাঁচি, দিঘা, গয়া ও দার্জিলিং ভ্রমণ করতে হতো। তৎকালীন সময়ে বলিহার রাজপ্রাসাদ থেকে সরাসরি সান্তাহার জংশন এবং সেখান থেকে দার্জিলিং মেইলে চড়ে কলকাতা যেতে হতো। এই দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর যাত্রায় অসুস্থ রাজা আরও দুর্বল হয়ে পড়তেন।
রাজার এই ঘন ঘন অসুস্থতার কথা বিবেচনা করে পরিবারের পরামর্শে কলকাতা থেকে একজন উচ্চশিক্ষিত (পাস করা) চিকিৎসককে বলিহারে নিয়ে আসা হয়। রাজপ্রাসাদের সামনেই তাঁর জন্য স্থায়ী চেম্বার করে দেওয়া হয়। তিনি রাজপরিবারের পাশাপাশি সাধারণ প্রজাদেরও চিকিৎসা সেবা দিতেন এবং সার্বক্ষণিকভাবে রাজার স্বাস্থ্যের তত্ত্বাবধান করতেন।
বলিহার হাউস নির্মাণের সূচনা
ভ্রমণকালীন সময়ে এবং কলকাতা যাতায়াতের পথে রাজার একটু বিশ্রামের জন্য নওগাঁ শহরে একটি স্থায়ী আবাসের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এরই প্রেক্ষিতে দুবলহাটি রাজার কাছ থেকে নেওয়া জমিতে ১৯২৯ সালের দিকে বলিহার হাউস নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। ‘টমাস’ নামের একজন ব্রিটিশ প্রকৌশলী (ইঞ্জিনিয়ার) এই মূল ভবন ও এর চারপাশের আনুষঙ্গিক স্থাপনাগুলোর নকশা তৈরি করেন।
তৎকালে এই স্থানটি গভীর জঙ্গলে আবৃত ছিল। জঙ্গল পরিষ্কার করে প্রথমে উত্তর দিকে একটি বিশাল খড়ের দোচালা শেড তৈরি করা হয়। সেই শেডের নিচে ‘নুনিয়ারা’ (চুন প্রস্তুতকারক) দল বেঁধে ঢেঁকির সাহায্যে চুন, সুরকি ও চুনবালুর মিশ্রণ তৈরি করত। মূল রাজপ্রাসাদ নির্মাণের আগে, বর্তমান প্রধান ফটকের বাম পাশে একটি লাল রঙের চৌচালা ভবন নির্মাণ করা হয় (যা বর্তমানে প্রায় ভগ্নদশা)। এই ভবনে বসেই কলকাতা থেকে আসা প্রকৌশলী এবং বলিহার এস্টেটের রাজকর্মকর্তারা নির্মাণকাজ তদারকি করতেন। উল্লেখ্য, এই সময়েই ‘নওগাঁ গাঁজা কাল্টিভেটরস কো-অপারেটিভ সোসাইটি’র উদ্যোগে নওগাঁ একটি আধুনিক শহরের রূপ পেতে শুরু করেছিল।
রাজকীয় উদ্বোধন ও নির্মাণযজ্ঞ
১৯২৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বলিহার হাউসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। সেদিন বলিহার প্রাসাদ থেকে মোটরযানে করে সপরিবারে আসেন রাজা শরদিন্দু রায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন রানী কুসুম কামিনী দেবী, রাজমাতা শিবসুন্দরী দেবী, গণেশজননী দেবী এবং কুমার বিমলেন্দু রায় ও তাঁর স্ত্রী ইন্দু প্রভা দেবী। রাজপুরোহিত বারই গাঙ্গুলী শাস্ত্রীয় আচার মেনে শুভ উদ্বোধন ও পূজার আয়োজন সম্পন্ন করেন।
বলিহার এস্টেটের নায়েব রমণী কান্ত দাস এবং তরুণ রাজকুমার বিমলেন্দু রায় এই ভবনটি নির্মাণে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। নায়েব রমণী কান্ত দাসের সাথে সুসম্পর্ক ছিল তৎকালীন নওগাঁর প্রখ্যাত রাজমিস্ত্রি ও ঠিকাদার কেদারনাথের। ফলে ভবনের সম্পূর্ণ নির্মাণভার কেদারনাথের ওপর ন্যস্ত করা হয়। তাঁরই দক্ষ তদারকিতে ১৯৩৩ সালের প্রথম দিকে বলিহার হাউসের নির্মাণকাজ শেষ হয়। এই ভবন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় লোহার কড়ি-বর্গা, দরজা-জানালা, সিঁড়ির রেলিং সহ যাবতীয় আধুনিক নির্মাণসামগ্রী কলকাতা থেকে রেলপথে সান্তাহার এবং সেখান থেকে বিশেষ নৌযান বা গরুর গাড়িতে করে নওগাঁয় আনা হয়েছিল।
স্থাপত্যের নান্দনিকতা ও বৈজ্ঞানিক কৌশল
নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে প্রাসাদের চারপাশে একটি সুউচ্চ প্রাচীর দেওয়া হয়। এই প্রাচীরটি অত্যন্ত চমৎকার ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নির্মাণ করা হয়েছিল। দেয়ালের উপরিভাগের গাঁথুনি এমনভাবে করা হয়, যেন বাইরের বাতাস পরিশোধিত হয়ে ভেতরের ফুলবাগানে প্রবেশ করতে পারে, অথচ বাইরে থেকে ভেতরের কিছুই দৃশ্যমান না হয়। প্রাচীরের এই মজবুত কাঠামোর সিংহভাগ আজও টিকে আছে।
প্রাসাদের কারুকার্যখচিত ঝুলবারান্দাটি ছোট যমুনা নদীমুখী। ভবনের দুপাশে বুরুজ আকৃতির গোল ঘরের ডান পাশের অংশটি তিন তলার ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত, যা আজও প্রাসাদের আভিজাত্য প্রকাশ করে। ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার পর রাজা শরদিন্দু রায়, কুমার বিমলেন্দু রায় এবং নায়েব রমণী কান্ত দাসকে নিয়ে কলকাতা যান। সেখান থেকে তাঁরা বিদেশে তৈরি বিশাল আকারের পিয়ানো, বিলিয়ার্ড টেবিল, ঝাড়বাতি, বৈদ্যুতিক জেনারেটর, কার্পেট, সোফা, রাজকীয় পালঙ্ক, আরামকেদারা এবং মূল্যবান বইপুস্তক কিনে আনেন। লোহার কড়ি-বর্গার পাশাপাশি ইটের খিলানের ব্যবহারে এই দ্বীতল প্রাসাদটি তৎকালেই এক আধুনিক রূপ পরিগ্রহ করে।
শেষ দিনগুলো ও মালিকানার বিবর্তন
১৯৩৩ সালে নির্মাণের পর থেকে ১৯৩৮ সালের মার্চ মাসে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রাজা শরদিন্দু রায় কলকাতা যাতায়াতের সময় এখানে অবস্থান ও বিশ্রাম নিতেন। রাজার উপস্থিতির কারণে এখানে সার্বক্ষণিক একজন ম্যানেজার, পাইক-বরকন্দাজ, ওড়িশা থেকে আসা বাবুর্চি (রাধুনি বামুন ঠাকুর), মালি এবং দেউড়ির প্রহরী নিযুক্ত থাকত। জনশ্রুতি আছে, প্রাসাদের সুরক্ষায় আটজন সশস্ত্র বেসামরিক সিপাহিও নিয়োজিত ছিলেন। বর্ষাকালে ছোট যমুনা নদীর প্লাবনের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রাসাদের প্রতিটি স্থাপনা বেশ উঁচুতে নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রাসাদের প্রবেশদ্বারের লোহার ফ্রেমের ওপর এখনো ‘বলিহার হাউস’ নামটি খোদাই করা রয়েছে।
পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ১৯৫০ সালের জমিদারী প্রথা বিলুপ্তির আগেই বলিহারের শেষ রাজা বিমলেন্দু রায় ১৯৪৭ সালে সপরিবারে ভারতে চলে যান।
বর্তমান অবস্থা দেশভাগের পর ১৯৫০ সাল থেকে এই ঐতিহাসিক ভবনটি ‘ইপিআর’ (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) কমান্ডারের কার্যালয় ও বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। স্বাধীনতার পর এটি বিডিআর (বাংলাদেশ রাইফেলস) কমান্ডিং অফিসারের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ নওগাঁ পূর্ণাঙ্গ জেলায় রূপান্তরিত হলে ভবনটি পর্যায়ক্রমে নওগাঁ পুলিশ সুপারের কার্যালয়, সদর সার্কেল (পুলিশ) কার্যালয় এবং সবশেষে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি কার্যালয়) হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বর্তমানে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ভবনটির সংস্কার ও রঙ করার মাধ্যমে এর ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র: মৃত রিয়াজ উদ্দীন (বলিহার হাউসের প্রাক্তন নির্মাণ শ্রমিক)। মৃত নিবারন মহন্ত (প্রাসাদের প্রাক্তন টানপাখা চালক) এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল ও স্থানীয় সূত্র।
https://www.kaabait.com