মোঃ আসাদুজ্জামান বিশেষ প্রতিনিধিঃ ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় ৭ম শ্রেণি পড়ুয়া এক স্কুল ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায়, কন্যার পিতা মোঃ ইমদাদুল মিয়া (৩৮) কে হত্যার উদ্দেশ্যে নৃশংসভাবে কুপিয়ে জখম করার ঘটনায় একই এলাকার মাদকসেবী হিসেবে আখ্যায়িত মোঃ সুজন হোসেন (২২) ও তার ভাই সুমন হোসেন (৩৫) সহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
সোমবার (৩ আগস্ট) আনুমানিক সকাল সাড়ে নয়টায় মেয়েকে স্কুলে দিয়ে ফেরার পথে, স্থানীয় ৫নং কাপাশহাটীয়া ইউনিয়নের চারাতলা বাজারে একটি চায়ের দোকানে নৃশংস এই হামলার ঘটনাটি ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবার জানান, ইমদাদুল মিয়া কাপাশহাটীয়া কলেজ পাড়ার মোসলেম মন্ডলের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন প্রবাসে (মালেশিয়া) ছিলেন। তিনি প্রবাসে থাকাকালীন, তার স্ত্রী রত্না খাতুন (৩২) ও ৭ম শ্রেণি পড়ুয়া কন্যা রিনা খাতুন (১৩) কে নিয়মিত উত্ত্যক্ত করে আসছিল প্রতিবেশী জিহাদ হোসেন, আলামিন হোসেন, সুজনসহ স্থানীয় মাদকসেবীদের একটি বিশেষ চক্র। পরবর্তীতে, ইমদাদুল মিয়া দেশে ফিরে স্ত্রী-কন্যা’র মানহানির ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ করেন। প্রথমদিকে এরই জেরে দু’পক্ষের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়। এক পর্যায়ে, ইমদাদুল মিয়ার পিতা মোসলেম হোসেন কলেজ প্রাঙ্গনে মাদকসেবনে বাঁধা দেয়ায়, অভিযুক্তরা কাপাশহাটীয়া কলেজে নাইটগার্ড হিসেবে কর্মরত মোসলেম হোসেনকে হত্যার হুমকি প্রদান করে। সেসময়, ক্ষিপ্ত হয়ে ইমদাদুল মিয়াও অভিযুক্তদের মাদকসেবনে বাঁধা দিয়ে তীব্র প্রতিবাদ করলে, ঘটনাটি জটিল আকার ধারণ করে। পরবর্তীতে, ভুক্তভোগী পরিবার হরিণাকুণ্ডু থানায় নিরাপত্তা জনিত কারণে একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। বিষয়টি আরও জটিল হলে, স্থানীয় ৬নং ওয়ার্ড মেম্বার ও মাতব্বরদের চাপে ঘটনাটি মীমাংসায় রূপ নেয়। তারপরেও এই হামলা হয়েছে।
হামলার বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সোমবার সকালে মেয়েকে স্কুলে দিয়ে এসে ইমদাদুল আমাদের সাথে দোকানে বসে চা পান শেষে গল্প করছিলেন। সেসময়, হঠাৎ করেই পেছন থেকে এসে সুজন ও তার লোকজন ইমদাদুল-কে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কো*পা*তে শুরু করে। সেসময়, উপস্থিত জনসাধারণ তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ করলে, সুজন ও তার দলবল পালিয়ে যায়। পরে আমরা সকলে মিলে গুরুতর আহত ইমদাদুল মিয়াকে হরিণাকুণ্ডু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করি।
এদিকে, নৃশংস সন্ত্রাসী হামলায় গুরুতর আহত ইমদাদুল মিয়ার সাথে হরিণাকুণ্ডু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন,
“আপনারা যা শুনেছেন, তা সবই সত্য। আমি প্রবাসে থাকাকালীন ওরা দীর্ঘদিন ধরে আমার ছোট্ট মেয়ে এবং আমার স্ত্রীকে উত্ত্যক্ত করে আসছিল। আমি দেশে ফিরে প্রতিবাদ করি। সেজন্য তারা আমাকে এবং আমার পরিবারের সদস্যদের একের পর এক হত্যার হুমকি দিতে থাকে। তখন নিরাপত্তা জনিত কারণে আমি হরিণাকুণ্ডু থানায় জিডিও করেছিলাম। পরে, মাহাবুব মেম্বার ও মাতব্বররা আমাকে ঘটনাটি মীমাংসার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। এক পর্যায়ে, মেম্বার মাহাবুব ও মাতব্বরা আমার কাছে প্রথমে ৩ লক্ষ টাকা এবং পরে পাঁচ লক্ষ টাকা দাবি করে। আমি চাঁদা দিতে রাজি হইনি। আমি আইনের আশ্রয় নিতে দৃঢ়তা দেখালে, সেসময় টাকা-পয়সা ব্যতীতই ঘটনাটি তারা মীমাংসা করে। এর মধ্যেই হুট করে সেদিন আমার উপরে এই হামলা চালানো হলো! আমার মেয়ে রিনা ভালকি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী। আমি তাকে স্কুলে দিয়ে ফেরার পথে, স্থানীয় চারাতলা বাজারে চায়ের দোকানে থাকাকালীন হামলার শিকার হয়েছি। আমি সরকারের কাছে আমার পরিবারের নিরাপত্তা ও ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। আমি আমার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। ওরা ভয়ংকর মানুষ। ওরা মাদকাসক্ত এবং মাদক ব্যবসায়ী।”
এবিষয়ে মামলার বাদী ইমদাদুল মিয়ার স্ত্রী রত্না খাতুন বলেন,
” আমাদের বাড়িতে পুরুষের সংখ্যা নেই বললেই চলে। উনিও দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলেন। এই সুযোগ নিয়ে ওরা নিয়মিত আমার মেয়ে ও আমাকে বাজেভাবে হেনস্তা করে আসছে। আমরা থানায় জিডি করেও, নিরাপত্তা পেলাম না! এতবড় নৃশংস হামলার পরেও পুলিশ অভিযোগই নিচ্ছিলো না! এখনো কোন আসামিও ধরা পড়েনি। ওরা মাদকাসক্ত। ওরা খুবই ভয়ংকর। আমার স্বামীর জীবন আজ সংকটাপন্ন। আমার স্কুল পড়ুয়া ছোট্ট মেয়ে! আমাদের বেঁচে থাকা এখন অনিশ্চিত। পুলিশ টাকা খেয়ে নামে মাত্র তদন্ত করছে।”
এবিষয়ে জানতে চাইলে, ৫নং কাপাশহাটীয়া ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ড মেম্বার মাহাবুব কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সেসময় তার কথাবার্তায় স্পষ্টই বোঝা যায় যে, তিনি অভিযুক্তদের পক্ষ অবলম্বন করছেন। এমনকি এতবড় ঘটনার পরেও তিনি জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাক ভূমিকা পালন করেছেন।
হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত অভিযোগের বিষয়ে হরিণাকুণ্ডু থানার ওসি তদন্ত (বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত থানা ইনচার্জ) অসিত কুমার রায়ের সাথে সাক্ষাৎ করলে তিনি বলেন,
“জিডির বিষয়ে আমি অবগত নই। তবে, হামলায় ঘটনায় প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্তের দায়িত্বে আছেন উপ-পরিদর্শক বিপুল হোসেন। তিনিই বিষয়টি দেখছেন।”
সেসময়, ভারপ্রাপ্ত ওসি (তদন্ত) অসিত কুমার রায় সাংবাদিকদের একাধিক প্রশ্ন এড়িয়ে যান।
এদিকে, এতবড় নৃশংস হামলায় অত্র এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুরো এলাকা জুড়ে বিরাজ করছে থমথমে পরিবেশ। সেইসাথে, পুলিশের নির্বাক ভূমিকায় ভুক্তভোগী পরিবার ভুগছেন চরম নিরাপত্তাহীনতায়।
https://www.kaabait.com