এস কে জাফর আলম টেকনাফ (কক্সবাজার) উপজেলাঃ ১৯৭৮ সালের পর থেকে রোহিঙ্গা সংকট দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী মানবিক ও রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা কয়েক দশক ধরে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। এই সময়ে বারবার সামরিক অভিযান, সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে।
১৯৭৮: প্রথম বৃহৎ উদ্বাস্তু সংকট
১৯৭৮ সালে মিয়ানমারের তৎকালীন সামরিক সরকার "অপারেশন নাগামিন" (ড্রাগন কিং) পরিচালনা করে। সরকার দাবি করেছিল, এটি অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করার অভিযান। তবে বহু রোহিঙ্গা অভিযোগ করেন যে, অভিযান চলাকালে হত্যা, নির্যাতন ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে। এর ফলে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
১৯৮২: নাগরিকত্ব আইন
১৯৮২ সালে মিয়ানমারে নতুন নাগরিকত্ব আইন প্রণয়ন করা হয়। এই আইনে রোহিঙ্গাদের দেশের স্বীকৃত জাতিগত গোষ্ঠীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এর ফলে অধিকাংশ রোহিঙ্গা কার্যত রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েন। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, চলাচল, কর্মসংস্থান ও বিয়েসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
১৯৯১–৯২: দ্বিতীয় দফার উদ্বাস্তু প্রবাহ
১৯৯১ ও ১৯৯২ সালে রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সামরিক অভিযান ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। এর ফলে আবারও প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। পরে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় অনেককে ফিরিয়ে নেওয়া হলেও সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি।
২০১২: সাম্প্রদায়িক সহিংসতা
২০১২ সালে রাখাইনে বৌদ্ধ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বহু মানুষ নিহত হন এবং হাজার হাজার ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়ে শিবিরে বসবাস শুরু করে।
২০১৬–২০১৭: নতুন সংকট
২০১৬ সালে সীমান্ত পুলিশ চৌকিতে হামলার পর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান শুরু করে। এরপর ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার জেরে আরও বড় সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এই অভিযানে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ তুলে।
এর ফলে ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে কয়েক মাসের মধ্যে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। তাদের অধিকাংশ বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছে। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী শিবিরে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের ভূমিকা
বাংলাদেশ মানবিক বিবেচনায় বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এত বড় জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও সামাজিক ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে বলে সরকার ও বিভিন্ন বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশ বারবার জোর দিয়ে বলেছে, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই সংকটের টেকসই সমাধান।
আন্তর্জাতিক উদ্যোগ
জাতিসংঘ, বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) গণহত্যা সনদ লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা চলছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা মানবিক সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। তবে এখনো রোহিঙ্গাদের ব্যাপক ও স্থায়ী প্রত্যাবাসন সম্ভব হয়নি।
বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমানে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে প্রায় ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। তাদের জন্য খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার, জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যৌথভাবে কাজ করছে। একই সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা, অপরাধ দমন এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট আজ শুধু একটি মানবিক সংকট নয়; এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে বিশ্বব্যাপী আলোচিত।