June 4, 2026, 10:49 am
নওগাঁ প্রতিনিধি:- সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন এক তরুণ। সোমবার নওগাঁ শহরের মুক্তির মোড়ে শহীদ মিনারে ঘণ্টাব্যাপী একক মানববন্ধন ও সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেন তিনি। বুকে ফেস্টুন এবং মাথায় ক্যাপ পরিহিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং সমাজের চলমান অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আহ্বান জানান।
এই তরুণের নাম সাইফুল ইসলাম শান্তি। তিনি দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের আমলাহার গ্রামের বাসিন্দা আবদুল মজিদের সন্তান। দীর্ঘদিন ধরে তিনি গুজব প্রতিরোধ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি প্রতিরোধসহ নানা সামাজিক ইস্যুতে কাজ করে আসছেন।
মানববন্ধন শেষে তিনি নওগাঁ শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করেন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালান।
প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে সাইফুল ইসলাম শান্তি বলেন, তিনি কোনো সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং একজন লজ্জিত ও উদ্বিগ্ন নাগরিক হিসেবে এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। সম্প্রতি নওগাঁয় জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধে চারজন মানুষের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “এই হত্যাকাণ্ড শুধু চারটি প্রাণহানির ঘটনা নয়; এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ, মানবিকতা এবং নৈতিকতার গভীর সংকটের প্রতিফলন। সামান্য জমির জন্য যখন মানুষ আপনজনের রক্ত ঝরাতে পারে, তখন বুঝতে হবে আমরা ভয়াবহ এক নৈতিক অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, জমি বা সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য দেশে বিদ্যমান আইনগত কাঠামো রয়েছে—ইউনিয়ন পরিষদ, ভূমি অফিস এবং আদালত। তবুও আইনকে পাশ কাটিয়ে সহিংসতার আশ্রয় নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ভূমি সংক্রান্ত মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে, কারণ দীর্ঘসূত্রিতা মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও সহিংসতা উসকে দেয়।
সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “পরিবারের ভেতরে বৈষম্য সৃষ্টি করা যাবে না। ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সবার মাঝে ন্যায্য সম্পদ বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারে অবিচার ও বঞ্চনাই অনেক সময় বড় ধরনের সংঘাতের জন্ম দেয়।”
তিনি বর্তমান সামাজিক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে পারিবারিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব থেকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভাইয়ের হাতে ভাই, আত্মীয়ের হাতে আত্মীয় কিংবা প্রতিবেশীর হাতে প্রতিবেশী হত্যার মতো ঘটনা সমাজে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।
সরকার ও রাষ্ট্রের প্রতি জোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, সামাজিক ও পারিবারিক কলহ নিরসনে কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশব্যাপী সেমিনার, পথনাটক, উঠান বৈঠকসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পাশাপাশি আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
তার ভাষায়, “অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে ভিড়ের প্রয়োজন হয় না—প্রয়োজন হয় সাহস ও নৈতিক অবস্থানের।”
শেষে তিনি একটি স্পষ্ট বার্তা দেন—“সহিংসতার পরিবর্তে আইনি পথ বেছে নিতে হবে, নীরবতা ভাঙতে হবে, এবং মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।”
এই একক উদ্যোগ ইতোমধ্যে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং অনেকেই এটিকে সামাজিক সচেতনতা তৈরির একটি শক্তিশালী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।